কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ১১ মে, ২০২৬ এ ০৫:৫৩ PM
কন্টেন্ট: পাতা
বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাত দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, পুষ্টি নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দুধ, মাংস ও ডিম উৎপাদনের মাধ্যমে জনগণের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কৃষি-নির্ভর অর্থনীতিকে শক্তিশালী করাই এই খাতের মূল লক্ষ্য। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, উৎপাদন বৃদ্ধি, রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং টেকসই উন্নয়নের ওপর ভিত্তি করে।
২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে প্রাণিসম্পদ খাতের প্রধান লক্ষ্য হলো দেশের প্রাণিজ খাদ্যের (দুধ, মাংস ও ডিম) উৎপাদন বৃদ্ধি করে আত্মনির্ভরতা অর্জন করা। পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা, প্রাণিস্বাস্থ্য উন্নয়ন, জলবায়ু সহনশীল খামার ব্যবস্থাপনা এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি করাও অন্যতম লক্ষ্য।
দেশে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা পূরণের জন্য দুধ, মাংস ও ডিম উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা, উন্নত জাতের পশু-পাখি পালন এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি করা হবে। দুধ ও মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকে আরও সম্প্রসারণ করে ভ্যালু অ্যাডেড পণ্য উৎপাদনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। ডিম উৎপাদন বৃদ্ধি করতে উন্নত লেয়ার খামার স্থাপন ও আধুনিক পোল্ট্রি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।
গবাদিপশুর জাত উন্নয়নের জন্য কৃত্রিম প্রজনন (Artificial Insemination) কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা হবে। উন্নত জাতের ষাঁড় ও বীজ ব্যবহার করে দুধ ও মাংস উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা হবে। স্থানীয় জাত সংরক্ষণ ও উন্নত জাত সংমিশ্রণের মাধ্যমে সহনশীল ও উৎপাদনশীল গবাদিপশু তৈরি করা হবে। এ লক্ষ্যে উপজেলা পর্যায়ে কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র ও প্রশিক্ষিত জনবল বৃদ্ধি করা হবে।
পশুখাদ্যের মান উন্নয়ন ও সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে উন্নত জাতের ঘাস চাষ সম্প্রসারণ করা হবে। টিএমআর (Total Mixed Ration) প্রযুক্তি, সাইলেজ উৎপাদন এবং খড় সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে। পাশাপাশি বাণিজ্যিক পশুখাদ্য কারখানার মান নিয়ন্ত্রণে আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপন ও নিয়মিত মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করা হবে। এতে খামারিদের খরচ কমবে এবং উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।
প্রাণিস্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে টিকা প্রদান কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত করা হবে। গবাদিপশু ও পোল্ট্রির বিভিন্ন সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। আধুনিক রোগ নির্ণয় ল্যাবরেটরি স্থাপন এবং দ্রুত ডায়াগনস্টিক সেবা নিশ্চিত করা হবে। মহামারি প্রতিরোধে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল (Rapid Response Team) গঠন ও মাঠ পর্যায়ে কার্যক্রম জোরদার করা হবে।
প্রাণিসম্পদ খাতে ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ করা হবে। অনলাইন নিবন্ধন, মোবাইল অ্যাপস, এসএমএস সেবা এবং ডিজিটাল ডাটাবেস ব্যবস্থার মাধ্যমে সেবা প্রদান আরও সহজ করা হবে। “ডিজিটাল লাইভস্টক ডাটাবেস” চালুর মাধ্যমে প্রতিটি খামারের তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। এতে সেবা দ্রুত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হবে।
খামারি, উদ্যোক্তা এবং মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করা হবে। আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা, রোগ প্রতিরোধ, পুষ্টি ব্যবস্থাপনা এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। নারীদের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতে তাদের ভূমিকা শক্তিশালী করা হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সহনশীল জাতের পশু-পাখি উন্নয়ন করা হবে। বন্যা, খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল খামার ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে, বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে। পরিবেশবান্ধব খামার (Eco-friendly Farming) সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
নিরাপদ ও মানসম্মত প্রাণিজ পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। দুধ, মাংস, ডিম এবং প্রক্রিয়াজাত পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করে বৈদেশিক বাজারে প্রবেশ সহজ করা হবে। হালাল সার্টিফিকেশন ও ফুড সেফটি মানদণ্ড বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রাণিসম্পদ খাতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামার (SME) উন্নয়নে ঋণ ও প্রণোদনা প্রদান করা হবে। গ্রামীণ এলাকায় বেকার যুবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে। নতুন জাত উদ্ভাবন, রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং খাদ্য উন্নয়নে গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করা হবে। আধুনিক প্রযুক্তি যেমন জেনেটিক ইমপ্রুভমেন্ট, বায়োটেকনোলজি এবং স্মার্ট ফার্মিং ব্যবস্থার ব্যবহার বৃদ্ধি করা হবে।
২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের প্রাণিসম্পদ খাতের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রাণিজ খাদ্য উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জন সম্ভব হবে। পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে এবং জনগণের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রাণিসম্পদ খাতকে একটি টেকসই, লাভজনক এবং রপ্তানিমুখী খাতে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।